২০১৩ সালে কুমিল্লার লাকসামে দুই বিএনপি নেতাকে গুম ও অপহরণের চাঞ্চল্যকর মামলার অন্যতম আসামি পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) অসিত কুমার রায়কে ঝিনাইদহ পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়েছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন ও গুমের ঘটনায় অভিযুক্ত এই পুলিশ কর্মকর্তা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরও বহাল তবিয়তে হরিণাকুণ্ডু থানায় ওসি তদন্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় বিএনপির একাংশকে ম্যানেজ করে তিনি এলাকায় সশস্ত্র চরমপন্থি, চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছিলেন। এই অপকর্মের সিন্ডিকেটে তার সঙ্গে একই থানার এসআই বিপুল ও শ্যামাপ্রসাদ জড়িত বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর বিএনপির অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে কুমিল্লার লাকসামে যৌথ বাহিনীর অভিযানের নামে এক ভয়াবহ গুমের ঘটনা ঘটে। ওইদিন রাত ৯টার দিকে লাকসাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম হিরুর মালিকানাধীন লাকসাম ফ্লাওয়ার মিলে অভিযান চালিয়ে ৯ জনকে আটক করা হয়।
অভিযানের খবর পেয়ে সাইফুল ইসলাম হিরু, লাকসাম পৌর বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন কবির পারভেজ এবং সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিন একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে কুমিল্লার দিকে রওনা হন। পথিমধ্যে লালমাই উপজেলার হরিশ্চর-আলীশ্বর এলাকায় সাদা পোশাকধারী র্যাব পরিচয়ে একদল ব্যক্তি তাদের গতিরোধ করে এবং একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। এই টিমের অন্যতম দায়িত্বে ছিলেন এসআই অসিত কুমার রায়। ওইদিন মধ্যরাতে ৯ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হলেও হিরু ও হুমায়ুন কবিরকে আর থানা হেফাজতে দেওয়া হয়নি।
পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ১৮ মে হুমায়ুন কবিরের পিতা রঙ্গু মিয়া বাদী হয়ে কুমিল্লা আদালতে র্যাব-১১-এর ৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপহরণ ও গুমের মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামিরা হলেন তৎকালীন র্যাব-১১ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর শাহেদ হাসান (রাজীব), ডিএডি শাহজাহান আলী, এসআই কাজী সুলতান আহমেদ এবং এসআই অসিত কুমার রায়। বর্তমানে মামলাটি পরিচালনা করছেন রঙ্গু মিয়ার ছোট ছেলে গোলাম ফারুক। দীর্ঘ ১১ বছরে পুলিশ, সিআইডি ও পিবিআই তদন্তের নামে সময়ক্ষেপণ করলেও অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের পর গঠিত গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে এই মামলার যাবতীয় তথ্য জমা দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জসিম উদ্দিন জানান, আটকের পর তাদের চোখ বেঁধে ফেলা হয়েছিল এবং গভীর রাতে লাকসাম থানায় চোখ খোলার পর হিরু ও হুমায়ুন কবিরকে আর পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ হুমায়ুন কবিরের স্ত্রী শাহনাজ আক্তার ও হিরুর ছেলে রাফসাল ইসলাম অভিযোগ করেন, তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলামের নির্দেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মেটাতে এই দুই নেতাকে গুম করা হয়েছিল।
সম্প্রতি হরিণাকুণ্ডু থানায় সাংবাদিকরা বক্তব্য নিতে গেলে অসিত কুমার রায় তাদের হেনস্তা করেন এবং স্থানীয় প্রেসক্লাবের অনুমতি ছাড়া বক্তব্য দেওয়া যাবে না বলে জানান। মোবাইল ফোনে মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান, তবে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটারের ভিডিওতে তিনি মামলার আসামি হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন।
হরিণাকুণ্ডু থানার নবাগত ওসি জুলফিকার আলী জানান, তিনি নতুন যোগ দিয়েছেন এবং অসিত রায় মামলার সাক্ষ্য দিতে আদালতে গেছেন। তার সঙ্গে অফিশিয়াল সাক্ষাৎ না হওয়ায় তিনি মামলার বিষয়ে বিস্তারিত অবগত নন।
ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিঞা মোহাম্মদ আশীষ বিন হাছান অসিত কুমার রায়কে ক্লোজ করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গুম ও অপহরণ মামলার আসামি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরপরই তাকে হরিণাকুণ্ডু থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কোনো দায়িত্বে নেই এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টারের নির্দেশনা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, ছেলে হারানোর শোকে ২০১৪ সালের ৩১ আগস্ট মামলার মূল বাদী রঙ্গু মিয়া মারা যান।
তার সঙ্গে আমার এখনো অফিশিয়ালি সাক্ষাত হয়নি।






আপনার কমেন্ট লিখুন