প্রকৃতির ক্ষুদ্র প্রাণীরাও যে আধুনিক প্রযুক্তির জন্য বড় ধরনের বিপত্তি তৈরি করতে পারে, তার আরেকটি নজির দেখা গেল ফ্রান্সে। উত্তর ফ্রান্সের গ্র্যাভেলিন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিগুলো জেলিফিশের বিশাল ঝাঁকের কারণে আবারও বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ঘটনাটি টানা দুই বছর একই দিনে ঘটেছে। ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট একই কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির চারটি ইউনিট বন্ধ হয়েছিল। এবারও ১১ আগস্ট বিপুলসংখ্যক জেলিফিশ পানি পাম্প করার ব্যবস্থায় ঢুকে পড়লে নিরাপত্তার স্বার্থে চুল্লিগুলো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।
পারমাণবিক চুল্লি শীতল রাখতে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। পাম্পের মাধ্যমে পানি সংগ্রহের সময় জেলিফিশের ঝাঁক সেখানে আটকে যায়, যা পানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটানোর আশঙ্কা তৈরি করে। ঝুঁকি এড়াতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
২০২৫ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছিল। কিন্তু এক বছর পর প্রায় একই সময়ে আবারও জেলিফিশের আক্রমণ দেখা দিল। ফ্রান্সের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইডিএফ জানিয়েছে, জেলিফিশ যেন কেন্দ্রের কাছাকাছি আসতে না পারে, সেজন্য সমুদ্রে মাছ ধরার নৌকা দিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুনরায় পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থাকতে পারে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়লে জেলিফিশের খাদ্য প্ল্যাঙ্কটনের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া উষ্ণ পানি জেলিফিশের জীবনচক্রকে ত্বরান্বিত করে এবং প্রজননকাল দীর্ঘায়িত করে, ফলে নির্দিষ্ট এলাকায় এদের অস্বাভাবিক উপস্থিতি দেখা দেয়।
প্রযুক্তির অবকাঠামোয় প্রাণীদের এমন হস্তক্ষেপ নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটে গত বছর একটি র্যাকুনের কারণে এক হাজারের বেশি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা ঘটেছিল। প্রাণীটি একটি উপকেন্দ্রের যন্ত্রপাতির ক্ষতি করলে প্রায় আড়াই হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন।
বিজ্ঞানের গবেষণাগারেও এমন অদ্ভুত ঘটনার নজির আছে। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে লিগো গবেষণাগারের অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্রে দাঁড়কাক ঠোকর দিচ্ছিল। বরফে ঢাকা পাইপে তাদের ঠোকরের কম্পন মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণে বাধা সৃষ্টি করছিল। পরে পাইপে বরফ জমার সুযোগ কমিয়ে দিলে দাঁড়কাকগুলোর উৎপাত বন্ধ হয়।
ইউরোপের বিখ্যাত গবেষণাগার সিইআরএন-এ ২০০৯ সালে একটি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা ঘটেছিল। কয়েক দিন ধরে মেরামতের পর জানা যায়, সেখানে পালক ও এক টুকরো রুটি পাওয়া গিয়েছিল। ধারণা করা হয়, কোনোভাবে একটি ফরাসি বাগেটের টুকরো যন্ত্রপাতির সমস্যার কারণ হয়েছিল।
এসব ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষ যত বেশি প্রকৃতির জায়গা দখল করে অবকাঠামো গড়ে তুলছে, বন্যপ্রাণীর সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনা ততই বাড়ছে। জেলিফিশ, র্যাকুন কিংবা দাঁড়কাক—প্রকৃতির প্রাণীরা সবসময় মানুষের তৈরি ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে চলবে না। কখনো কখনো ছোট্ট একটি প্রাণীই বিশাল প্রযুক্তি ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
২০১৭ সালে সেখানে গবেষকেরা দেখতে পান, কিছু দাঁড়কাক বরফে ঢাকা একটি ঠাণ্ডা পাইপে ঠোকর দিচ্ছে।
২০০৯ সালে সিইআরএনও একটি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনায় যন্ত্রপাতির মেরামত করতে কয়েক দিন সময় লেগেছিল।
মানুষের বিদ্যুৎ ও বিজ্ঞানভিত্তিক অবকাঠামোর জন্য বিপত্তি তৈরি করা প্রাণীর তালিকায় অবশ্য জেলিফিশ একা নয়।
প্রাণীটি কীভাবে এমনটি ঘটিয়েছিল, তা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
ফলে দাঁড়কাকগুলোকে পানি খাওয়ার জন্য অন্য জায়গা খুঁজে নিতে হয়।
বিভ্রাটের সঠিক কারণ আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে প্রাণীদের আবাসস্থল বদলে যাচ্ছে, তাদের আচরণেও পরিবর্তন আসছে।
এমনকি মানুষ থেকে প্রাণীদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটছে।










আপনার কমেন্ট লিখুন