
মো: মনিরুজ্জামান :
পাবনার চাটমোহরের ভাদুরহাট মোড় থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন স্থাপনা—তিন গম্বুজ বিশিষ্ট শাহী মসজিদ। প্রায় সাড়ে চার শতাব্দী আগে নির্মিত এই মসজিদ কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।
শিলালিপি অনুযায়ী, কাকশাল গোত্রের খান মুহাম্মদ তুকি খান ৯৮৯ হিজরি (১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে) এ মসজিদ নির্মাণ করেন। সে সময় সৈয়দ আবুল ফতে মুহাম্মদ মাসুম খাঁন চাটমোহরকে রাজধানী ঘোষণা করে স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন। সম্রাট আকবরের বিরোধী হিসেবে পরিচিত এই মাসুম খাঁন পরবর্তীতে বার ভূঁইয়াদের নেতা ঈসা খাঁর সঙ্গে যোগ দেন। তবে ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে সম্রাটের বাহিনীর হাতে তাঁর মৃত্যু হয়।
মসজিদের তিনটি প্রবেশপথ রয়েছে। প্রধান দরজার ওপরে কালো পাথরে খোদাই করা রয়েছে ‘কালেমা শাহাদাত’। ভেতরে পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব, আর দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ৬ ফুট ৯ ইঞ্চি। বাইরের অংশে ব্যবহৃত হয়েছে চিকন ও লম্বাটে ‘জাফরী ইট’, যা একে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। মসজিদের ভেতরে জায়গা সীমিত হলেও এর স্থাপত্যশৈলীর গাম্ভীর্য মুগ্ধ করে যে কাউকে।
সময়ের সাথে সাথে দেয়ালের ইট ক্ষয়ে গেলে ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর মসজিদটি সংস্কার করে সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা দেয়। বর্তমানে এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমা ও ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিদিনই স্থানীয় ও বাইরের মানুষ মসজিদটি দেখতে আসেন।
ঢাকা থেকে চাটমোহর যেতে চাইলে সুন্দরবন এক্সপ্রেস বা পদ্মা এক্সপ্রেসে করে সরাসরি চাটমোহর স্টেশনে নামা যায়। স্টেশন থেকে ভাদুরহাট মোড় মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে—অটোরিকশা বা ভ্যানে ১৫ মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যায় শাহী মসজিদে। চাটমোহর শহরে ভালো মানের খাবার হোটেল রয়েছে, এছাড়া পাবনা ও ঈশ্বরদীতে আছে আধুনিক আবাসনের ব্যবস্থা। চাইলে একদিনে ঘুরে একই দিনে ঢাকায় ফেরা সম্ভব।
বাংলার সুলতানী-মুঘল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন এই মসজিদ শুধু মুসল্লিদের উপাসনালয় নয়, এটি ইতিহাসেরও এক জীবন্ত দলিল। চাটমোহরে গেলে শাহী মসজিদ দর্শন আপনাকে নিয়ে যাবে চার শতাব্দী আগের ইতিহাসে, যখন এই জনপদে গড়ে উঠেছিল স্বাধীন শাসনের স্বপ্ন।
