রোমান্টিক সিনেমা বা উপন্যাসে প্রথম দেখায় প্রেমে পড়ার দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এটি কি কেবলই কল্পনা নাকি বাস্তবেও সম্ভব? বিজ্ঞান বলছে, বাস্তবেও প্রথম দেখায় প্রেম হওয়া সম্ভব এবং এই তীব্র আকর্ষণ অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের পথও তৈরি করতে পারে।
মস্তিষ্ক ও স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, কাউকে দেখার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার প্রতি ভালো লাগা তৈরি হতে পারে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোমান্টিক প্রেমের প্রাথমিক পর্যায় নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন, ঠিক কী কারণে মানুষের শরীরে এমন দ্রুত প্রতিক্রিয়া ঘটে।
গবেষকদের মতে, প্রেমের শুরুতে যে তীব্র আকর্ষণ অনুভূত হয়, তার পেছনে শরীরের বিশেষ কিছু রাসায়নিক পরিবর্তন দায়ী। এর মধ্যে অ্যাড্রেনালিন ও ডোপামিন অন্যতম। মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানভিত্তিক মনোবিজ্ঞানী স্যান্ড্রা ল্যাংসলাগ জানান, প্রথম দেখায় প্রেম মূলত একটি অত্যন্ত আবেগী ঘটনা। এই মুহূর্তে শরীরের সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা সাধারণত বিপদ বা উত্তেজনার সময় শরীরকে প্রস্তুত করে।
স্যান্ড্রা ল্যাংসলাগের মতে, এই প্রক্রিয়ায় হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বাড়ে এবং শরীর ঘামতে শুরু করে। অনেক সময় উত্তেজনায় মুখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো শারীরিক লক্ষণও দেখা দেয়। মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অংশটি শরীরে অ্যাড্রেনালিন নিঃসরণের সংকেত দেয়, যার ফলে হৃদপিণ্ডের গতি বৃদ্ধি পায়।
অন্যদিকে, নৃতত্ত্ববিদ হেলেন ফিশারের গবেষণায় উঠে এসেছে, পছন্দের কাউকে দেখলে মস্তিষ্কের আনন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত অংশগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেখানে ডোপামিন বা ‘ভালো লাগার রাসায়নিক’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডোপামিন কেবল আনন্দের অনুভূতিই দেয় না, বরং সেই মুহূর্তটিকে দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি হিসেবে মস্তিষ্কে গেঁথে রাখতেও সাহায্য করে।
মানুষের দ্রুত বিচার করার ক্ষমতার ওপরও প্রথম দেখায় প্রেমের বিষয়টি নির্ভর করে। নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক মনোবিজ্ঞানী ওয়েন্ডি গার্ডনারের মতে, আমরা মাত্র সাত সেকেন্ডের কম সময়েই অপরিচিত কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা তৈরি করে ফেলি। যদিও এই অল্প সময়ে কারো পুরো চরিত্র বোঝা সম্ভব নয়, তবুও মস্তিষ্ক মানুষের হাঁটাচলা, হাসি, চোখের চাহনি বা পোশাকের মতো বাহ্যিক সংকেতগুলো বিশ্লেষণ করে দ্রুত একটি সিদ্ধান্ত নেয়।
অনেক সময় সম্পূর্ণ অপরিচিত দুজন মানুষের মধ্যে একই বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির মিল খুঁজে পাওয়াও আকর্ষণের কারণ হতে পারে। কফিশপে বসে থাকা অবস্থায় কোনো সাধারণ বিষয়ে একই সঙ্গে হাসাহাসি করা বা একই গান পছন্দ করার মতো ছোট ছোট মুহূর্তগুলো মানুষের মধ্যে এক ধরনের মানসিক সংযোগ তৈরি করে। মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই সংযোগ সাময়িকভাবে একাকীত্বের অনুভূতি দূর করে এবং একে অপরের প্রতি বিশ্বাস ও ভালো লাগা তৈরি করে।
তবে প্রথম দেখায় তৈরি হওয়া এই তীব্র আকর্ষণই সম্পর্কের সফলতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী পল ইস্টউইক স্পষ্ট করেছেন যে, প্রথম দেখার আকর্ষণের সঙ্গে ভবিষ্যতের সম্পর্কের গভীরতা বা স্থায়িত্বের কোনো নির্ভরযোগ্য সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ, প্রথম দেখায় কাউকে ভালো লাগা মানেই যে সম্পর্কটি দীর্ঘস্থায়ী হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
গবেষকদের পরামর্শ হলো, কেবল প্রাথমিক আকর্ষণের ওপর ভিত্তি করে তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। অপরিচিত কাউকে জানার জন্য সময় নেওয়া প্রয়োজন। গভীর ও অর্থপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমেই কেবল একজন মানুষের চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ ও স্বভাব সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা পাওয়া সম্ভব।
প্রথম দেখায় বুক ধড়ফড় করা বা ভালো লাগা অবশ্যই সুন্দর একটি অনুভূতি। কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা গড়ে ওঠার জন্য সময়ের প্রয়োজন। অনেক সময় প্রথম দেখায় যে ধারণা তৈরি হয়, পরে তা ভুল প্রমাণিত হতে পারে। তাই প্রথম দেখার আকর্ষণকে উপভোগ করলেও, সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধৈর্যশীল হওয়া এবং একে অপরকে জানার সুযোগ দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
আর এই অ্যাড্রেনালিনই আমাদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, সাত সেকেন্ডেই আমরা একজন মানুষের পুরো বৈশিষ্ট্য বুঝে ফেলতে পারি।
এগুলো বুঝতে ও জানতে অনেক বেশি সময় লাগে।
কেউ কীভাবে তাকাচ্ছে, হাসছে, হাঁটছে, কী পোশাক পরেছে, তার মুখের গঠন কেমন, এসব বিষয় আমরা অনেক সময় সচেতনভাবে খেয়াল না করলেও মস্তিষ্ক সেগুলো লক্ষ্য করে।
বিশেষ করে চোখে চোখ রাখা, হাসি এবং শরীরের অঙ্গভঙ্গি আমাদের কাছে একজন মানুষকে আকর্ষণীয় বা পছন্দের করে তুলতে পারে।
গার্ডনারের ভাষায়, মানুষ আসলে বাইরের বৈশিষ্ট্য দেখে খুব সহজেই প্রভাবিত হয়।
আমরা যতই বলি, ‘আমি মানুষের চেহারা দেখি না’, বাস্তবে আমাদের মস্তিষ্ক অন্য মানুষের চেহারা ও আচরণ থেকে নানা সংকেত গ্রহণ করে।
বিশেষ করে যখন তারা মনে করেন, ‘আমরা হয়তো একইভাবে বিষয়টি দেখছি!’
হয়তো কারও পোশাক দেখে আপনার হাসি পেল, কিংবা কোনো গান শুনে আপনার ভালো লাগল।
ঠিক তখনই দেখলেন, কফিশপের অন্য প্রান্তে বসা একজন অপরিচিত মানুষও একই বিষয় দেখে হাসছেন।
আমরা মনে করি, অন্য একজন মানুষ আমাদের বুঝতে পারছেন।
একটি ছোট্ট হাসি, একই সময়ে একই বিষয়ে আনন্দ পাওয়া কিংবা হঠাৎ চোখে চোখ পড়ে যাওয়া—এমন সামান্য ঘটনাও মানুষের মনে ছাপ ফেলতে পারে।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আছে।
কিন্তু ওই সময়ে মানুষটি সম্পর্কে তেমন জানাশোনা থাকে না।
আবার কখনো সেই আকর্ষণ হারিয়েও যেতে পারে।


আপনার কমেন্ট লিখুন