
বিশেষ প্রতিনিধি: সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) অবস্থানরত লাখো অনথিভুক্ত, অবৈধ ও অদক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিককে দ্বিপাক্ষিক আইনি কাঠামোর আওতায় এনে দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি যুগান্তকারী মেগা প্রকল্পের নীতিগত অনুমোদন ও প্রস্তাবনা পেশ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হলে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের মানবেতর জীবনের অবসান ঘটার পাশাপাশি বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা সরাসরি জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রিজার্ভ সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রবাসীদের পক্ষ থেকে “UAE-BD Labor Transformation Initiative” শিরোনামের এই স্ব-অর্থায়িত ও চক্রাকার মেগা প্রজেক্টটি রূপরেখা আকারে পেশ করেছেন ইউএই প্রবাসী কর্মী, উদ্ভাবক-গবেষক এবং দৈনিক পাবনার আলোর সম্পাদক মাহফুজ আলী কাদেরী।
সংকট ও প্রাক-প্রেক্ষিত
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে উপযুক্ত কাগজপত্র ও দক্ষতার অভাবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি অবৈধ ও অনথিভুক্ত হিসেবে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। তারা স্থানীয় বাজারে শ্রম শোষণ ও বৈষম্যের শিকার হয়ে মাত্র ৮০৮ থেকে ১২০০ দিরহামের চরম নিম্ন মজুরিতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। আইনি জটিলতা ও ব্যাংকিং সুবিধা না থাকায় এসব শ্রমিক অবৈধ হুন্ডি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং চ্যানেল ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। এ সংকট থেকে উত্তরণে প্রকল্পটিতে ইউএই ও বাংলাদেশের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে (G2G) বিশেষ আমনেস্টি ও কূটনৈতিক চুক্তির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
২ কোটি ৯০ লক্ষ ডলারের স্ব-অর্থায়িত মূলধন
মেগা প্রজেক্টটির জন্য মোট প্রাথমিক মূলধনী বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ২ কোটি ৯০ লক্ষ মার্কিন ডলার (২৯ মিলিয়ন ডলার)। এটি সরকারের কোনো একমুখী অনুদান বা অনুত্তোলনযোগ্য বাজেট নয়, বরং সম্পূর্ণ চক্রাকার অর্থনৈতিক মডেলে পরিচালনা করা হবে। এই ফান্ডের ৪০ শতাংশ প্রবাসী কল্যাণ বোর্ডের অলস তহবিল, ৪০ শতাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংক কনসোর্টিয়ামের সিন্ডিকেটেড ঋণ এবং ২০ শতাংশ ইউএই-র বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের CSR ফান্ড থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ফান্ডের আওতায় শ্রমিকদের জমে থাকা ইমিগ্রেশন জরিমানা মওকুফ, আকামা বৈধকরণ, আরটিএ কমার্শিয়াল ড্রাইভিং লাইসেন্স ও লজিস্টিকস রাইডার পারমিটের ফি প্রদান, এআই-চালিত ল্যাঙ্গুয়েজ ও ভোকেশনাল অ্যাপ বিকাশ এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের লজিস্টিক অবকাঠামো তৈরি করা হবে।
৫-স্তরের গতিশীল বাস্তবায়ন রূপরেখা
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মূলত পাঁচটি স্তর বা ফেইজ অনুসরণ করা হবে:
১. আইনি সুরক্ষা অর্জন: বিশেষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ইউএই সরকারের থেকে নিবন্ধিত শ্রমিকদের জন্য ‘আইনি সুরক্ষা উইন্ডো’ নেওয়া, যাতে ইমিগ্রেশন বা পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার বা ফেরত না পাঠায়।
২. ডিজিটাল প্রাক-স্ক্রিনিং: বিশেষ মোবাইল অ্যাপ ও কনস্যুলার বুথের মাধ্যমে অনথিভুক্ত প্রবাসীদের ডিজিটাল বায়োমেট্রিক গ্রহণ ও শারীরিক-মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতা যাচাই।
৩. জামানতবিহীন ফিনটেক মাইক্রো-লোন: কোনো জামানত ছাড়াই প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ প্রদান, যা সরাসরি ইউএই সরকারি পোর্টালে ভিসা ও আমনেস্টি ফি হিসেবে পরিশোধ হবে।
৪. উচ্চ আয়ের নিবিড় প্রশিক্ষণ: ১ থেকে ৩ মাসের ক্র্যাশ কোর্সে কমার্শিয়াল ড্রাইভার, আইটি ও কারিগরি টেকনিশিয়ান হিসেবে প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং এবং NQA অনুমোদিত সনদ প্রদান।
৫. করপোরেট প্লেসমেন্ট: ট্রেনিং শেষে কারীম, নুন, তলাবাত ও বড় কনস্ট্রাকশন গ্রুপে কাজ নিশ্চিতকরণ। এর ফলে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন বেতন বেড়ে দাঁড়াবে ২৫০০ থেকে ৪০০০ দিরহামে।
০% ঋণ খেলাপিতে ফিনটেক ও ডব্লিউপিএস মডেল
ঋণ আদায় নিশ্চিত করতে ইউএই সেন্ট্রাল ব্যাংকের ‘ওয়েজ প্রটেকশন সিস্টেম’ (WPS) ব্যবহার করা হবে। নিয়োগকর্তারা প্রতি মাসে শ্রমিকদের বেতন ছাড় করার সময় সিস্টেমের মাধ্যমে উৎস থেকেই ১০০ ডলার সমপরিমাণ কিস্তি কেটে সরাসরি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে জমা করবে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স ব্যাকড আর্থিক প্রণোদনা, সময়মতো কিস্তি পরিশোধে পরিবারকে দেশে বিশেষ চিকিৎসা সুবিধা ও শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব রিটার্ন
প্রকল্পটির সামাজিক ও গাণিতিক প্রাক্কলনে দেখা যায়, প্রশিক্ষণ ও ভিসা স্থানান্তরের পর একজন শ্রমিকের গড় বেতন সাধারণ ১২০০ দিরহাম থেকে বেড়ে ৩৫০০ দিরহামে উন্নীত হবে, যা নিট ১৯১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এনে দেবে। মাত্র ২.১৮ মাসের মধ্যে প্রতি কর্মীর পেছনে করা বিনিয়োগের সমপরিমাণ অর্থ রেমিট্যান্সের মাধ্যমে ফেরত আসবে। সর্বোপরি, এই প্রজেক্টের মাধ্যমে প্রতি বছর অতিরিক্ত ৯ কোটি ৬০ লক্ষ মার্কিন ডলারের (প্রায় ১,১৫০ কোটি টাকা) বৈ বৈদেশিক মুদ্রা শতভাগ বৈধ চ্যানেলে জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রবাসীদের সম্মান রক্ষা এবং জাতীয় অর্থনৈতিক সুরক্ষা বাস্তবায়নে প্রকল্পটি দ্রুত নীতিগত অনুমোদন দিয়ে উচ্চপর্যায়ের জিটুজি (G2G) টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।









আপনার কমেন্ট লিখুন