
মোঃ সিয়াম,(পাবনা):
সরকারি যেকোনো দপ্তর, মন্ত্রণালয় কিংবা মাঠপর্যায়ের প্রশাসনে ঘুষ, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ পেলেই মিলছে ‘বদলি’র পুরস্কার। সিভিল প্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তাদের দুর্নীতির খবর গণমাধ্যমে এলে বা তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা মিললে রাতারাতি জারি হয় স্ট্যান্ড রিলিজ বা বদলির নির্দেশ। কিন্তু যে কর্মকর্তা এক স্থানে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়মের স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, তিনি নতুন কর্মস্থলে গিয়েও একই অপকর্ম অব্যাহত রাখছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে—বদলি কি দুর্নীতির প্রতিকার, নাকি অপরাধের স্থান পরিবর্তন মাত্র? জনমনে ধারণা জন্মেছে, সরকারি আমলা ও কর্মকর্তাদের জন্য দুর্নীতির সর্বোচ্চ সাজা শুধুই এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে যাওয়া। অথচ দেশের প্রচলিত আইন ও তদন্ত কাঠামোর সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও ফৌজদারি—উভয় বিচার ব্যবস্থার অধীনেই অত্যন্ত কঠোর শাস্তির সুস্পষ্ট আইনি বিধান রয়েছে।
সরকারি প্রশাসনিক নথিপত্র এবং ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ ও ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বদলিকে আইনি ভাষায় কোনো ‘দণ্ড’ বা ‘শাস্তি’ হিসেবে গণ্য করা হয় না। যেকোনো সরকারি দপ্তর বা প্রশাসনে দায়িত্ব পালনকালে অপরাধ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে লঘুদেণ্ড হিসেবে বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা, নিম্ন পদে অবনমিত করা বা রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি নিজ তহবিল থেকে কেটে নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। অন্যদিকে গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর, অপসারণ এবং চূড়ান্ত বরখাস্তের বিধান স্পষ্ট উল্লেখ আছে, যেখানে বরখাস্ত হলে পরবর্তীতে কোনো সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় চাকরির সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। এর পাশাপাশি, দুর্নীতি একটি সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন ও দণ্ডবিধির আওতায় জেল, জরিমানা এবং অবৈধভাবে অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রীয়ভাবে বাজেয়াপ্ত করার কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতাও বিদ্যমান।
প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে অর্থ দাবি ও অনিয়মের অকাট্য প্রমাণ মিললে সাময়িক বরখাস্ত বা বিভাগীয় মামলা দায়েরের কথা থাকলেও বাস্তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অদৃশ্য কারণে থমকে যায় চূড়ান্ত ব্যবস্থা। অভিযোগ উঠলে সাময়িক সরিয়ে দেওয়া বা অন্য জেলায় স্থানান্তরিত করা হলেও কিছুদিন পর প্রভাবশালী মহলের ছায়ায় বা তদন্তের ফাঁক গলে তারা আবার নতুন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন পেয়ে যান।
প্রশাসনিক তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে এই বদলি-সংস্কৃতির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যায় আইনি প্রক্রিয়ার ধোঁয়াশা, দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক সিন্ডিকেট। যেকোনো পর্যায়ে অপরাধ উদ্ঘাটিত হলে জনরোষ এড়াতে ও তদন্তের স্বার্থে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বদলি করা হলেও সাধারণ মানুষের কাছে এটিকেই ‘চূড়ান্ত সাজা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে বিভাগীয় মামলা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে শেষ না করে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হয় এবং তদন্ত প্রতিবেদন দুর্বল করে সাজিয়ে অভিযুক্তকে পার পাইয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি একই ক্যাডার, সার্ভিস বা প্রশাসনিক সহকর্মীকে রক্ষা করার অভ্যন্তরীণ মানসিকতার কারণে গুরুদণ্ড না দিয়ে হালকা সতর্কবার্তা কিংবা স্থানান্তরের মাধ্যমেই পুরো বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।
আইন বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, বদলি সংস্কৃতির এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে রাষ্ট্রকে কেবল লোকদেখানো স্থানান্তরে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। দুর্নীতির চূড়ান্ত আইনি বিচার নিশ্চিত করতে ৯০ দিনের নির্দিষ্ট মেয়াদে তদন্ত শেষ করে গুরুদণ্ড প্রয়োগ করা, যেকোনো সরকারি দপ্তর বা প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার ঘুষের টাকায় কেনা সম্পদ চিহ্নিত করে বাজেয়াপ্ত করা এবং দুদকের ফৌজদারি বিচার ত্বরান্বিত করে সরাসরি চাকরিচ্যুতির দৃষ্টান্ত তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে দুর্নীতির স্থান পরিবর্তন অব্যাহত থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জনগণের ভোগান্তি আর রাষ্ট্রের লোকসান কোনোভাবেই থামানো যাবে না।
