• Wed. Aug 5th, 2026

দৈনিক পাবনার আলো, মাহফুজ আলী কাদেরী কর্তৃক সম্পাদিত

#pabnaralo#, pabna# pabnanews# পাবনারআলো# পাবনার_আলো#পাবনারখবর#পাবনারবার্তা

অনলাইন জুয়ার বিষাক্ত থাবা: পাবনা শহরের বিকাশ ডিস্ট্রিবিউশন হাউসের ‘বেনামী’ সিমে পাচার কোটি কোটি টাকা

ByFardin Zaman

Aug 5, 2026

মোঃ সিয়াম,জেলা প্রতিনিধি পাবনা

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা সাধারণ ওয়েবসাইট,ইন্টারনেটে ঢুকলেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে চটকদার ও লোভনীয় সব অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনোর বিজ্ঞাপন। অতি অল্প সময়ে বিপুল অর্থের মালিক হওয়ার এই রঙিন মায়াজালে পা দিয়ে দেশের হাজার হাজার তরুণ, কিশোর ও বিভিন্ন বয়সের মানুষ আজ নিঃস্ব হতে বসেছে। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে দেশের সম্ভাবনাময় যুবসমাজ। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ তথ্য,এই অবৈধ জুয়ার সুবিশাল সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার মূল রসদ ও অক্সিজেন জোগাচ্ছে দেশের জনপ্রিয় মোবাইল আর্থিক সেবা বিকাশ, নগদ ও রকেটের এজেন্ট নেটওয়ার্ক। বিশেষ করে পাবনা শহরসহ দেশের আঞ্চলিক ডিস্ট্রিবিউশন হাউসগুলোর অনৈতিক কারসাজি, জালিয়াতি ও বেপরোয়া সিম বাণিজ্যের ওপর ভর করেই আজ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এই জুয়ার বিষবৃক্ষ। আজ পাবনা শহরে এমনই একটি ডিস্ট্রিবিউশন হাউসের অপরাধকাণ্ড হাতেনাতে ধরে ফেলার পর এই চক্রের থলের বিড়াল বেরিয়ে এসেছে।
অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলোতে অ্যাকাউন্ট খুলে গেম খেলতে বা বাজি ধরতে প্রথমেই প্রয়োজন হয় ডিপোজিট বা টাকা রিচার্জ করা। আর এই টাকা লেনদেনের প্রধানতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বিকাশ, নগদ ও রকেটের পার্সোনাল ও এজেন্ট অ্যাকাউন্ট। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে,আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে হাজার হাজার অবৈধ এজেন্ট নম্বর কীভাবে জুয়া পরিচালনা করা বিদেশি ও দেশি মাস্টারমাইন্ডদের হাতে পৌঁছায়? এর নেপথ্য কাহিনী উন্মোচন করলে দেখা যায় বিকাশ, নগদ ও রকেটের স্থানীয় ডিস্ট্রিবিউশন হাউসগুলোর গভীর ও অনৈতিক অপরাধচক্র। মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানিগুলো থেকে প্রতি মাসে ডিস্ট্রিবিউশন হাউসগুলোকে নতুন এজেন্ট সিম চালু করা এবং লেনদেনের পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়ানোর জন্য বিশাল অঙ্কের ‘টার্গেট’ বেঁধে দেওয়া হয়। টার্গেট পূরণ করতে পারলে মেলে মোটা অঙ্কের কমিশন, আর ব্যর্থ হলে ঝুলতে হয় জরিমানা বা ডিস্ট্রিবিউটরশিপ হারানোর ঝুঁকিতে। এই অবাস্তব ও মানসিক চাপের মুখে পড়ে ডিস্ট্রিবিউশন হাউসের অসাধু মালিক ও ফিল্ড অফিসাররা (এসআর/ডিএসও) সম্পূর্ণ অবৈধ ও অপরাধমূলক পথের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
তারা অত্যন্ত সুচতুরভাবে ভুয়া নাম-ঠিকানা, সাধারণ মানুষের অজান্তে সংগৃহীত জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স বা ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে শত শত ভূতের মতো বেনামী বা ভুতুড়ে এজেন্ট সিম সচল করে। কাগজে-কলমে কোনো প্রত্যন্ত এলাকার মুদি দোকান, চায়ের দোকান বা রিচার্জ পয়েন্টের নাম ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে অনুসন্ধানে গেলে দেখা যায় ঐসব তথাকথিত দোকানের কোনো অস্তিত্বই নেই। পাবনা শহরের ডিস্ট্রিবিউশন হাউসেও ঠিক একইভাবে ভুয়া কাগজপত্র ও অস্তিত্বহীন দোকানের নামে বিপুল পরিমাণ বিকাশ, নগদ ও রকেটের এজেন্ট সিম সক্রিয় রেখে তা অপরাধীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছিল। পরবর্তীতে এই সিমগুলো চড়া দামে এবং মাসভিত্তিক মোটা অঙ্কের চুক্তিতে পৌঁছে যায় অনলাইন জুয়ার দেশীয় প্রধান এজেন্টদের হাতে।
জুয়ারিরা যখন তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকাতে বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে ক্যাশ-ইন করে, তখন সেই টাকা সরাসরি চলে যায় জুয়ারিদের এই ভুতুড়ে এজেন্ট অ্যাকাউন্টে। এরপর জুয়ার মাস্টারমাইন্ডরা প্রতিদিন সংগৃহীত কোটি কোটি টাকা ডিস্ট্রিবিউশন হাউসের অসাধু যোগসাজশে ক্যাশ-আউট করে নেয় এবং হুন্ডি চক্র, ক্রিপ্টোকারেন্সি (যেমন ইউএসডিটি, বিটকয়েন) ও অবৈধ ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার মাধ্যমে সরাসরি বিদেশে পাচার করে দেয়। এভাবে একদিকে হাজার হাজার পরিবার দেউলিয়া হয়ে পথের ভিখারি হচ্ছে, যুবসমাজ অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে, অন্যদিকে দেশের কষ্টার্জিত কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রা প্রতিদিন বিদেশে পাচার হয়ে মারাত্মক সংকটে ফেলছে জাতীয় অর্থনীতিকে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও অর্থ-অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল মাঠপর্যায়ের দু-একজন সাধারণ জুয়াড়ি কিংবা ভাড়াটে এজেন্টকে গ্রেপ্তার করে এই ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক মহামারি থামানো কখনোই সম্ভব নয়। এই অপরাধের মূল উপড়ে ফেলতে হলে আঘাত হানতে হবে এর আসল উৎসে। আজ পাবনা শহরের ডিস্ট্রিবিউশন হাউসের জালিয়াতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড যেভাবে উন্মোচিত হয়েছে, ঠিক একইভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা বিকাশ, নগদ ও রকেটের প্রতিটি ডিস্ট্রিবিউশন হাউসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিএফআইইউ (BFIU)-এর সমন্বয়ে বিশেষ অভিযান চালাতে হবে। প্রতিটি ডিস্ট্রিবিউশন হাউসের ইস্যু করা এজেন্ট সিমের বিপরীতে উল্লেখিত দোকান ও বায়োমেট্রিক মালিকানা সরেজমিনে অডিট ও কঠোর যাচাই-বাছাই করা জরুরি। কোনো ডিস্ট্রিবিউশন হাউসের ইস্যুকৃত সিমে অবৈধ জুয়া বা হুন্ডির লেনদেন ধরা পড়লে কেবল ঐ সিম ব্লক করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; বরং সংশ্লিষ্ট ডিস্ট্রিবিউটরের লাইসেন্স চিরতরে বাতিল করতে হবে এবং ঘটনার পেছনে থাকা ডিস্ট্রিবিউশন হাউসের মালিক ও কর্মকর্তাদের সরাসরি ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অর্থপাচার আইনে গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বিকাশ, নগদ ও রকেটের ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ককে শতভাগ স্বচ্ছতা ও কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হলেই কেবল এই অনলাইন জুয়ার ভয়াল ধ্বংসলীলা থেকে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব।

অনুসন্ধান চলমান……….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *