১৮৯০ সালে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ উইলিয়াম জেমস একটি কৌতূহল উদ্দীপক তত্ত্ব দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, ৩০ বছর বয়সের পর মানুষের ব্যক্তিত্ব অনেকটা প্লাস্টারের মতো শক্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ, এই বয়সের পর মানুষের স্বভাব বা আচরণে বড় কোনো পরিবর্তন আসে না এবং মানুষ একই ছাঁচে থেকে যায়। যুগের পর যুগ ধরে মনোবিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষের মনে এই প্রশ্নটিই বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে—সময়ের সঙ্গে আমরা কি সত্যিই আমূল বদলে যাই, নাকি আমাদের ভেতরের মানুষটি মূলত একই থাকে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আধুনিক বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরে হাজারো মানুষের ওপর পর্যবেক্ষণ চালিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে প্রকাশিত ‘বাল্টিমোর বার্ধক্যবিষয়ক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা’ ব্যক্তিত্বের এই রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গবেষক আন্তোনিও তেরাচিয়ানো, পল কোস্টা ও রবার্ট ম্যাকক্রে এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন। গবেষণায় এক হাজারেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অংশ নেন এবং তাদের জীবনের গতিপথ টানা ৪২ বছর ধরে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষকদের মূল লক্ষ্য ছিল ২০ থেকে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য কীভাবে পরিবর্তিত হয় তা বোঝা।
গবেষণায় তথ্য সংগ্রহের জন্য দুটি প্রধান পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। ‘গিলফোর্ড-জিমারম্যান টেম্পারামেন্ট সার্ভে’ বা ‘জিজেডটিএস’ পরীক্ষার মাধ্যমে ৭৩৭ জন পুরুষ ও ৩২৬ জন নারীর ব্যক্তিত্বের ধরন বিশ্লেষণ করা হয়। এছাড়া ‘রিভাইজড নিও পার্সোনালিটি ইনভেন্টরি’ বা ‘নিও-পিআই-আর’ পরীক্ষার মাধ্যমে ৩৬৭ জন পুরুষ ও ৩০৯ জন নারীর ব্যক্তিত্বের আরও সূক্ষ্ম দিক পরিমাপ করা হয়। চার দশকের বেশি সময়ের এই বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা ব্যক্তিত্বের স্থায়িত্ব সম্পর্কে নতুন ধারণা পেয়েছেন।
ফলাফলে দেখা যায়, উইলিয়াম জেমসের পুরোনো ধারণার মধ্যে কিছুটা সত্যতা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, ৩০ বছর বয়সের পর মানুষের ব্যক্তিত্বে এক ধরনের গভীর স্থিতিশীলতা তৈরি হয়। তথ্য অনুযায়ী, একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের স্থিতিশীলতার হার সাধারণত প্রায় ৭০ শতাংশ, যা সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। বিষয়টি বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা ‘এসিম্পটোট’ বা স্থিতাবস্থার ধারণাটি ব্যবহার করেছেন। যেমন, গরম চা টেবিলে রাখার পর শুরুতে দ্রুত তাপমাত্রা কমলেও পরে তা ঘরের তাপমাত্রার কাছাকাছি গিয়ে স্থির হয়ে যায়, ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনও অনেকটা তেমনই।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে মানুষের চরিত্র ও স্বভাবে তুলনামূলক বেশি পরিবর্তন দেখা গেলেও ৩০ বছরের পর সেই পরিবর্তনের গতি অনেকটাই কমে আসে। এর অর্থ এই নয় যে ৩০ বছরের পর মানুষ আর বদলায় না, বরং ব্যক্তিত্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো তুলনামূলকভাবে স্থির থাকে। ২০ থেকে ৪০ বছরের দীর্ঘ ব্যবধানেও মানুষের ব্যক্তিত্বের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো সাধারণত হারিয়ে যায় না, বরং একটি শক্ত ভিতের ওপর টিকে থাকে।
ব্যক্তিত্বের এই স্থায়িত্বের পেছনে বংশগতির ভূমিকা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ডিএনএ বা বংশগতি ব্যক্তিত্ব ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিন বিভিন্ন সময়ে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় হয়, যা ব্যক্তিত্বের কাঠামো বজায় রাখতে সাহায্য করে। এই জন্মগত বৈশিষ্ট্যগুলো জীবনের নানা পরিবর্তনের মধ্যেও আমাদের মূল সত্তাকে অনেকটা স্থির রাখে, যার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে একজন মানুষকে একই ধরনের স্বভাবের অধিকারী হিসেবে চেনা সম্ভব হয়।
তবে ব্যক্তিত্বে যে কখনোই বড় কোনো পরিবর্তন আসে না, তা কিন্তু নয়। গবেষক পল কোস্টা ও রবার্ট ম্যাকক্রে ব্যক্তিত্বের বড় ধরনের পরিবর্তনকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন—‘ক্র্যাকিং’ বা ফাটল ধরা এবং ‘ক্রাম্বলিং’ বা ধীরে ধীরে ক্ষয় হওয়া। ‘ক্র্যাকিং’ অনেকটা কাচের ওপর হাতুড়ির আঘাতের মতো, যা গভীর ক্লিনিক্যাল বিষণ্নতা বা ভয়াবহ কোনো ট্রমার কারণে ঘটে। অন্যদিকে ‘ক্রাম্বলিং’ একটি ধীর প্রক্রিয়া, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক সংকোচনের ফলে ঘটে থাকে।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যাপক পরিবর্তন দেখা গেছে। অধিকাংশ মানুষের ব্যক্তিত্বই তুলনামূলকভাবে স্থির ছিল। সামগ্রিক গবেষণার ফল বলছে, মানুষের ব্যক্তিত্ব যথেষ্ট স্থিতিশীল হলেও তা অপরিবর্তনযোগ্য নয়। বয়স, অভিজ্ঞতা, জীবনের বড় ঘটনা এবং শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের প্রভাব ব্যক্তিত্বে পড়তে পারে।
২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে পরিবর্তনের গতি বেশি থাকলেও ৩০ বছরের পর ব্যক্তিত্বের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো শক্ত ভিত্তি পায়। তাই ৩০ বছরকে ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনের সম্পূর্ণ শেষ সীমা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। গবেষণায় উঠে আসা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ স্থিতিশীলতা আমাদের পরিচয় ধরে রাখতে সাহায্য করে, আর বাকি অংশের পরিবর্তন আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার ও পরিণত হওয়ার সুযোগ দেয়। শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিত্বের এই স্থায়িত্বই আমাদের একটি স্বতন্ত্র ও ধারাবাহিক পরিচয় তৈরি করে।
জীবনের মাঝপথে এসে ব্যক্তিত্বের এই স্থিরতা কি বৈজ্ঞানিক সত্য নাকি কেবল একটি ধারণা?
দীর্ঘ এই গবেষণার ফল ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে প্রচলিত অনেক ধারণাকেই নতুনভাবে দেখার সুযোগ দিয়েছে।
গবেষকেরা এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা থেকে বোঝা যাবে মানুষের ব্যক্তিত্ব আসলে কতটা স্থায়ী।
বিষয়টি সহজভাবে বোঝার জন্য এক কাপ গরম চায়ের কথা ভাবা যেতে পারে।
যদি ব্যক্তিত্ব প্রতিদিন বদলে যেত, তাহলে কাছের মানুষদের জন্যও একজন ব্যক্তিকে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ত।
কেউ যদি গভীর ক্লিনিক্যাল বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন বা জীবনে ভয়াবহ কোনো ট্রমার মধ্য দিয়ে যান, তাহলে তার পরিচিত ব্যক্তিত্বের কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।







আপনার কমেন্ট লিখুন