ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নতুন যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। এরপর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। চলতি বছরের ডিসেম্বর কিংবা আগামী বছরের জানুয়ারি মাস নাগাদ এই নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে এবং পর্যায়ক্রমে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, ৩১শে জুলাই পর্যন্ত নিবন্ধিত ভোটারদের নিয়ে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের কাজ চলছে। এই তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পরই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। এছাড়া নির্বাচনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুতির জন্য কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং আগের মতোই এই নির্বাচনগুলো ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে বলে কমিশন জানিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, বর্তমানে নির্বাচন কমিশন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কাজ পুরোদমে শুরু হবে। এদিকে, নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নতুন আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত করে ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, ২০১৬ সালের পরিবর্তে এবার পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য একটি সমন্বিত আচরণবিধি প্রণয়ন করা হয়েছে, যা আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
নতুন আচরণবিধিতে পোস্টার ব্যবহারের সুযোগ না থাকলেও ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন এবং প্রথমবারের মতো বিলবোর্ড ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এসব প্রচারসামগ্রীর আকার ও ব্যবহারের সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। যেমন, ব্যানারের সর্বোচ্চ আকার ১০ ফুট বাই ৪ ফুট এবং বিলবোর্ড ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট হতে পারবে। সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। এছাড়া প্রচারসামগ্রী অবশ্যই সাদা-কালো রঙের হতে হবে এবং তাতে প্রার্থীর ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কিছু ব্যবহার করা যাবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্রচারণার ক্ষেত্রেও নতুন নির্দেশনা থাকছে। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং অনলাইন প্রচারের ব্যয় প্রার্থীর নির্বাচনী খরচের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তি বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। মাইক ব্যবহারের সময়সীমা দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং জরিমানার পরিমাণ ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে, পাশাপাশি প্রার্থিতা বাতিলের বিধানও রাখা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তৎকালীন সময়ে দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনেকে আত্মগোপনে আছেন বা মামলার আসামি হয়েছেন। ফলে অনেক উপজেলা ও জেলা পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই, সেখানে নির্বাহী কর্মকর্তারা বা সরকার মনোনীত প্রশাসকরা দায়িত্ব পালন করছেন। ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাতেও একই স্থবিরতা বিরাজ করছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ সেবা পেতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সর্বশেষ ২০২১ সালের ২১শে জুন প্রথম ধাপে ২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, ভোলা, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওইসব পরিষদের মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে।
ইসি সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠানের বিধান রেখে গত জুলাইয়ে আইন পাস হওয়ার পর আচরণবিধি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়।
ব্যানারের সর্বোচ্চ আকার হবে ১০ ফুট বাই ৪ ফুট, লিফলেট ও হ্যান্ডবিল এ-ফোর আকারের, ফেস্টুন ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি এবং বিলবোর্ড সর্বোচ্চ ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট হতে পারবে।
প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা ছয় ফুটের বেশি করা যাবে না।
মাইকে প্রচারের সময়ও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।
ফেস্টুন ও হ্যান্ডবিলে পলিথিনের আবরণ বা পিভিসি ব্যবহার করা যাবে না।
জাতীয় নির্বাচনের মতো ফ্রি স্টাইলের ভোটে তারা নির্বাচিত হন।
শূন্য জেলা পরিষদেও দলীয় নেতাদের প্রকাশক হিসেবে বসিয়েছে সরকার।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশনেও একইভাবে প্রশাসক দিয়ে চালানো হচ্ছে।
এমন অবস্থায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
সাধারণ মানুষকে সেবা পেতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।










আপনার কমেন্ট লিখুন