ভূমধ্যসাগরে ভাসমান অবস্থায় ১৫ বাংলাদেশি উদ্ধার, দেশে ফেরানোর উদ্যোগ

প্রকাশিত: 11 August 2026, 2:25:25 PM

ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে পাড়ি জমানোর চেষ্টাকালে সাগরে ভাসমান অবস্থায় ১৫ বাংলাদেশি ও ৩২ মিশরীয় নাগরিকসহ মোট ৪৭ জনকে উদ্ধার করেছে ডেনমার্কের বাণিজ্যিক জাহাজ ‘মায়েরস্ক’। উদ্ধারকৃতদের পরবর্তীতে মিশরীয় নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং নৌবাহিনী তাদের পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি সেন্টারে নিয়ে যায়।

এই ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই কায়রোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস তৎপর হয়ে ওঠে। দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গৌতম কুমার দে এবং প্রথম সচিব (শ্রম) মো. জাকির হোসেন পোর্ট সাঈদে গিয়ে সুয়েজ ক্যানাল কর্তৃপক্ষের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি সেন্টারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের আইনি সহায়তা প্রদান ও দ্রুত দেশে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি সেন্টারের পুলিশ প্রধান নিশ্চিত করেছেন যে, উদ্ধার হওয়া ১৫ বাংলাদেশি নাগরিক বর্তমানে তাদের হেফাজতে রয়েছেন। দূতাবাসের কর্মকর্তারা সরাসরি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছেন। ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারা ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে লিবিয়ায় পৌঁছান। সেখানে অবস্থানকালে ইউরোপে অনিয়মিতভাবে প্রবেশের প্রলোভনে তারা মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়েন। অনেকে লিবিয়ার বিভিন্ন মাফিয়া চক্রের হাতে আটক হওয়ার পর সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।

পাচারকারীদের সঙ্গে মৌখিক চুক্তির মাধ্যমে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করেছেন। এই অর্থের জোগান দিতে অনেকে নিজেদের জমিজমা পর্যন্ত বিক্রি করেছেন। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, জনপ্রতি ১০ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পাচারকারীদের দেওয়া হয়েছে। গত ১০ জুলাই দিবাগত রাতে লিবিয়ার তবরুক থেকে একটি রাবারের নৌকায় করে তারা গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। নেভিগেশন ব্যবস্থাহীন সেই নৌকাটি দিক হারিয়ে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সমুদ্রে ঘোরার পর জ্বালানি শেষ হয়ে অচল হয়ে পড়ে। টানা দুই দিন তিন রাত খাবার ও পানীয় জল ছাড়াই সাগরে ভাসতে থাকা এই যাত্রীরা শেষ পর্যন্ত ডেনমার্কের জাহাজ ‘মায়েরস্ক’-এর নজরে আসেন এবং উদ্ধার পান।

দীর্ঘ সময় প্রতিকূল পরিবেশে সাগরে থাকায় ১৫ বাংলাদেশির অনেকেই শারীরিকভাবে অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়েছেন। উদ্ধার হওয়া ১৫ বাংলাদেশি হলেন—মুন্সিগঞ্জের মো. শাওন খান, সুনামগঞ্জের মো. সাজুর আহমেদ, সুলেমান মিয়া, মো. সেলিম হোসেন, মো. মেহেদী হাসান ও মো. মাসুম মিয়া; হবিগঞ্জের মো. সবুজ আহমেদ, মো. সারওয়ার হোসেন, জয় শেখ, আব্দুল আওয়াল চৌধুরী, মো. শিহাব উদ্দিন ও তুহিন মিয়া; ফরিদপুরের মো. সাইম শেখ; কিশোরগঞ্জের মো. তোফায়েল হোসেন এবং সিলেটের জয়নাল উদ্দিন।

দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মো. জাকির হোসেন জানিয়েছেন, মিশরের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাদের পাসপোর্ট নেই, তাদের জন্য ট্রাভেল পারমিট ইস্যুর ব্যবস্থাও করা হয়েছে। একইসঙ্গে, ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকতে এবং মানবপাচারকারীদের প্রলোভনে পা না দিতে তিনি বাংলাদেশি নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশি নাগরিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে তারা পৃথকভাবে লিবিয়ায় যান।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেত্রবিশেষে প্রত্যেকে ১০ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করেছেন।

তাদের জানানো হয়েছিল, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁছাতে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা সময় লাগবে।

নৌকাটি স্পিডবোটের ইঞ্জিনে চালিত হলেও এতে কোনো নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না।

কিন্তু নেভিগেশন ব্যবস্থা না থাকায় নৌকাটি দিক হারিয়ে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ভূমধ্যসাগরে ঘুরতে থাকে।

জীবন বাঁচাতে রাতে দূরে কোনো জাহাজের আলো দেখা গেলে মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে সাহায্যের সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করেন তারা।

গ্রিসে পৌঁছানোর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তারা হতাশ হলেও বর্তমানে দ্রুত বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

আরও খবর

আপনার কমেন্ট লিখুন

Your email address will not be published.